স্কিপ করে মূল কন্টেন্ট এ যান
This article contains Amazon affiliate links. If you buy through these links, I earn a commission at no extra cost to you.

শিল্পী হওয়া একটি সত্যিকারের পেশা এবং শিল্পকলা বিনামূল্যে নয়

একজন শিল্পকলা শিক্ষক হিসেবে শেখা পাঠ

যখন আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলার প্রথম বর্ষে পড়তাম, তখন "দক্ষিণ নালাপাড়ায়" "প্রীতি আঁকালয়" নামের একটি শিল্পকলা বিদ্যালয়ে আমি শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করি। সেই প্রতিষ্ঠানে আমার একাডেমিক যাত্রার বিস্তারিত বিবরণ আমার একাডেমিক পটভূমিতে আরও বর্ণনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিনে একটি মেয়ে তার স্কুলের কাজের জন্য একটি স্কেচ করে দিতে বলল। আমি পুরো দুই ঘণ্টার শিল্পকলা ক্লাস ব্যয় করে A3 আকারের একটি বেশ বড় স্কেচ সম্পন্ন করলাম।

মেয়েটিও খুব খুশি হলো। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বা প্রধান আমাকে ডেকে ধন্যবাদ জানালেন এবং তারপর বললেন:

"চারুকলার বড় ভাই হিসেবে তোমাকে একটু পরামর্শ দিই। কখনো কোনো শিল্পকর্ম বিনামূল্যে করো না! অন্তত দুই টাকা হলেও নাও। যদি বিনামূল্যে দাও, তাহলে তুমি শুধু নিজের নয়, অন্য শিল্পীদেরও আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।"

সেই সময় আমি তাঁর কথার মূল্য বুঝতে পারিনি, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুরা যদি উপহার হিসেবে কোনো কাজ চায় তাহলে কী-ই বা করার আছে!! আর দাম চাইতে গেলে আমার এত লজ্জা লাগে!

Art is not free

@Anik Dhar

দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়া একটি সফর

তবে অনেক দিন পরে তাঁর কথার মূল্য বুঝতে পেরেছিলাম। একবার মায়ের সাথে এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখতে তাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমাদের বসার ঘরে বসতে দেওয়া হলো। বাড়ির লোকজন আসার আগে আমি তাকের পুরনো বইগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম।

হঠাৎ দেয়ালে ঝোলানো একটি জরাজীর্ণ ছবিতে আমার চোখ আটকে গেল। পাশে ফ্রেমটা একটু ভাঙা, কিন্তু কাজের ধরনটা আমার কাছে খুব পরিচিত মনে হলো। আমি এগিয়ে গিয়ে শিল্পীর স্বাক্ষর খুঁজলাম, এবং পেলামও — সাথে কলম দিয়ে বাচ্চাদের কিছু আঁকিবুঁকিও।

আমার এক শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের আঁকা ছবি দেখে খুশি হওয়ার বদলে মনটা বিষণ্ণ হয়ে গেল। প্রথমেই মাথায় এলো যে, এই ছবিটা নিশ্চয়ই তারা উপহার হিসেবে বা বিনামূল্যে পেয়েছে। নইলে এত সুন্দর একটি ছবি এবং একজন ভালো শিল্পীর কাজ এভাবে অবহেলিত হতে পারে না। পরে জানলাম আমার ধারণাই ঠিক। কোনোভাবে তারা আমার শিক্ষকের আত্মীয়।

শিল্পের স্বীকৃতির অভাব

আমাদের দেশে, বিশেষত চট্টগ্রামে, মানুষের শিল্প সম্পর্কে ধারণা খুবই কম। কেউ কেউ মনে করেন চারুকলায় পড়াশোনা মানে শুধু পোস্টার আঁকা বা ফুলের লতাপাতা আঁকতে পারা। আমার আরেকজন শিক্ষক বলেছিলেন, একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহকর্মী তাঁকে বলেছিলেন: একটা আর্টের (পোস্টার, ব্যানার) দোকান দিয়ে ফেলো।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কেউ যখন এমন ধারণা রাখেন, তখন সাধারণ মানুষের কথা আর কী বলব!! আবার কেউ কেউ মনে করেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা গাঁজা খেয়ে আর মদ পান করে টাকা উড়িয়ে দেয়। অন্য বিভাগের বন্ধুরা বলে, তোমাকে প্রতি মাসে প্রাইভেট টিউটর রাখতে হয় না, অনেক বই কিনতে হয় না, ফটোকপি নোটও লাগে না। আর সপ্তাহে একদিন-দুইদিন টিউশনি করেই অনেক টাকা কামাও।

কেউ জানে না কয়েক গজ ক্যানভাস কাপড় আর কয়েক কেজি কেরোসিন কাঠ একটু সস্তায় কিনতে একজন চারুকলার শিক্ষার্থীকে কোথায় কোথায় যেতে হয়, কিছু ধরনের তেলরঙের বাজারদর কতটা চড়া এবং তুলির দাম কত।

কেউ জানে না দোকানে কত রকমের পেন্সিল পাওয়া যায়। দুই-তিনটা ছোট ক্যানভাস কিনতে গিয়ে পুরো মাসের টিউশনির টাকা শেষ হয়ে যায়। ক্যামেলের তেলরঙ কিনতে না পেরে মারিসের তেলরঙ নিয়ে ফেরার দীর্ঘশ্বাস কেউ দেখে না। শিল্পকর্মে ভাবনাকে রূপ দিতে কত রাত ঘুমহীন কাটে, সেটাও সবার অজানা।

আর সবচেয়ে বড় কথা হলো একটুখানি কৃতজ্ঞ হওয়া। অনেকে খুঁত ধরতে ব্যস্ত থাকেন,
"ওটা ওভাবে হলে ভালো হতো"; "গ্রামের দৃশ্য না এঁকে এসব আজেবাজে আঁকছ"; "পোর্ট্রেটে মিল নেই"; আর কত কী!!!

শিল্প ও শিল্পীর প্রতি অসম্মান

আবার অনেকে বিনামূল্যে পেয়ে যাওয়ার পর একজনের প্রাপ্য মূল্য দিতে অস্বীকার করেন।
অনেকে রসিকতা করে বলেন যে "আর্থিক সংকট না থাকলে শিল্পী হওয়া সম্ভব না!!" একজন মানুষ তার প্রতিভা, পরিশ্রম আর ভালোবাসার সমন্বয়ে একটি শিল্পকর্ম তৈরি করেন। শিল্প ও শিল্পী উভয়েরই ন্যূনতম সম্মান প্রাপ্য। এটি এমন একটি সংগ্রাম যা ভিনসেন্ট ভ্যান গখ-এর মতো শিল্পীরা সবচেয়ে চরম রূপে মূর্ত করেছিলেন, সারাজীবন অপরিচিত থেকে মাস্টারপিস তৈরি করে গেছেন।