সূর্যমুখী আমার নিজের, এক অর্থে - ভিনসেন্ট ভ্যান গখ
একজন মানুষ কতটা উদার হতে পারেন তা আমি জানি না — যদি কষ্টার্জিত অর্থ আর দামি পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া যায়, অথবা যদি একজন প্রেমিক হিসেবে নিজের কান কেটে প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া যায়?
ভিন্ন শিল্পীর জন্য ভিন্ন জীবন
আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো অস্বাভাবিক। কেউ যদি এমন কিছু করে, রাগ হওয়া বা পাগল মনে করাটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। কিন্তু জীবনের সংজ্ঞা হয়তো আলাদা হয় এমন একটি শিশুর কাছে যে নিজের নাম একটি কবরের উপর দেখে বড় হয়েছে, অথবা যে একজন মৃত ভাইয়ের অস্তিত্ব খুঁজতে গিয়ে নিজের অনস্তিত্বের যন্ত্রণায় ভোগে।
হয়তো সেজন্যই তারা পরিবার ছাড়া একাকী জীবন কাটাতে পারেন, মাত্র ১০ বছরের শিল্পীজীবনে ২,১০০টি শিল্পকর্ম তৈরি করতে পারেন, যার মধ্যে ৬০টি তেলরঙে আঁকা। আর ৩৭ বছর বয়সে গভীর বিষাদ নিয়ে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ভিনসেন্ট ভ্যান গখ: যন্ত্রণাক্লিষ্ট শিল্পী
হ্যাঁ, সেই অস্থির, পাগলাটে, অবহেলিত শিল্পীর নাম ভিনসেন্ট উইলিয়াম ভ্যান গখ। তিনি ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ নেদারল্যান্ডসের জুন্ডার্টে জন্মগ্রহণ করেন। সারাজীবনে তিনি মাত্র একটি ছবি সামান্য মূল্যে বিক্রি করতে পেরেছিলেন। "তারাভরা রাত" বর্তমানে মোনালিসার পরে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক আইকনিক চিত্রকর্ম। বিশ্বের সেরা ১০টি বিখ্যাত চিত্রকর্মের মধ্যে ২/৩টিই ভ্যান গখের, এবং একটি ছবি শত শত কোটি ডলারে বিক্রি হয়েছে। অথচ জীবদ্দশায় তাঁকে আর্থিক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে, ছোট ভাইয়ের টাকায় জীবন চালাতে হয়েছে।
আত্মীয়, পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশী — সকলের কাছ থেকেই তিনি ছিলেন ঘৃণিত ও অবহেলিত। জীবনে যাকেই বন্ধু হিসেবে কাছে টানতে চেয়েছেন, সে-ই তাঁকে আঘাত করে দূরে ঠেলে দিয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন চার বছরের ছোট ভাই থিও ভ্যান গখ। যিনি শিল্পী ভ্যান গখকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মানসিক সমর্থন ও অনুপ্রেরণাও জুগিয়েছিলেন।
দুই ভাইয়ের মধ্যে আদান-প্রদান করা চিঠিগুলো তাদের বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতার গভীর ছাপ বহন করে। থিও যেন ভিনসেন্টকে নিরাপদ রাখার চেষ্টা করতেন, শুধু ভাই হিসেবে নয়, একটি সন্তানের মতো করেও। তাই ভিনসেন্টের আত্মহত্যার চেষ্টার খবর পেয়ে তিনি ছুটে গিয়েছিলেন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর পাশে ছিলেন। ভিনসেন্টের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে থিওও মারা যান।
অনুপ্রেরণার এক উৎস
ভিনসেন্ট ভ্যান গখ শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়, এটি একটি অনুপ্রেরণার নাম। যিনি পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সমস্যা ও অবহেলার মাঝেও প্রতিটি শিল্পের শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করেন। অনেকটা এস এম সুলতানের মতোই, তিনি তাঁর শিল্পের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন, যখন পৃথিবী তাঁর মূল্য স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিল। শিল্প শিক্ষার্থ হওয়ার সুবাদে আমারও সোভাগ্য হয়েছে তার জীবন আর কাজ সম্পর্কে জানার।
ভ্যান গখ মিউজিয়াম পরিদর্শন
আমার জন্মের ১০০ বছরেরও বেশি আগে মারা যাওয়া এই স্বল্পায়ু মানুষটিকে আমার কাছে খুব পরিচিত ও আপন মনে হয়। আর সেই কারণেই আমি ভ্যান গখ মিউজিয়াম দেখতে আমস্টারডামে গিয়েছিলাম। সামনে থেকে ভ্যান গখের কাজ দেখার অনুভূতি আলাদা, যা বই পড়ে বা ছবি দেখে অনুভব করা সম্ভব নয়।
আমি নিশ্চিত ভিনসেন্ট ভ্যানগখ এর আঁকা সর্বশেষ পেইন্টিং "গমক্ষত আর কাক" এর সামনে দাঁড়ালে যে কেউ বিষণ্ণ না হয়ে পারবে না। প্রতিদিন শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে বা অনলাইনে টিকিট কিনে এই মিউজিয়ামে আসেন। অনেকে টিকিট না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। ডাচ সরকার টিকিট বিক্রি, চিত্রকর্মের প্রতিলিপি, উপহারসামগ্রী ও ব্যাগ বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। কিন্তু একটি বিষয় আমাকে অনেক ভাবায়…
কেন ভিনসেন্ট তাঁর দেশ ছেড়েছিলেন, কেন তিনি একজন গির্জার পাদ্রি থেকে কয়লা শ্রমিকের জীবন বেছে নিয়েছিলেন, কেন একজন ছবি বিক্রেতা থেকে শিল্পে আশ্রয় নিয়েছিলেন? তিনি তাঁর জীবনের শেষ কয়েকটি বছর ফ্রান্সের একটি ছোট শহর আর্লে কাটিয়েছিলেন।
তার পেইন্টিং এ রঙের প্রলেপ আর তুলির প্রতিটি আঁচড়ে ফুটে ওঠে তার ভেতরের দ্বন্দ্ব আর অস্থিরতার চিত্র। প্রথম দিকের কাজগুলোতে ইম্প্রেশনিজম এর প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকলেও ধীরে ধীরে তার তুলি চালনা আর রঙের খেলা ইম্প্রেশনিজমকে বহুদূর ছাড়িয়ে যায়। শেষ দিকে যেন আরও লাগামহীনভাবে এগিয়ে চলে, ছবি আঁকা বা রং নিয়ে খেলার সময় সে যেন অন্য কোন জগতে অথবা একটা ঘোরের মধ্যে চলে যেত।
শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত সরলতা
তিনি "গের্নিকা", "আদমের সৃষ্টি" বা "শেষ নৈশভোজ"-এর মতো কোনো গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে আঁকেননি, বরং এঁকেছিলেন সূর্যমুখী ফুল, চেয়ার, তৃণভূমি, বাগান, তারাভরা রাত, রাতের কফি শপ, এবং আলু খেতে বসা কৃষক পরিবার। যেন তিনি তাঁর আঁকার ধরনের মাধ্যমে সাধারণ জিনিসগুলোকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মনে হয় যেন তিনি তাঁর দৈনন্দিন জীবনকেই ক্যানভাসে এঁকে রেখেছিলেন।
আর্লেতে এক তীর্থযাত্রা
একদিন আমি অবশ্যই আর্লে এ যাব, সেই নাইট ক্যাফে বা হলুদ শোবারঘর টি এখনও তেমন আছে কিনা জানিনা। তবে সেই গমক্ষেত তো আছে, । একটু না হয় গমক্ষেত আর সমুদ্রের তীরে হেঁটে আসবো।
বাতাসে নিশ্চয়ই এখনও ভিনসেন্ট ভ্যানগখ এর সুবাস থাকবে, গমক্ষেতের কাকগুলি এখনও হয়ত আগের মত উড়াউড়ি করে, নিশ্চয়ই তারা এখনও তাকে ভুলতে পারে নি....এখনও হয়তো ওভাবে রাত নামে, তারা ভরা স্বপ্নীল রাত আর দূরের গীর্জার ঘণ্টা ধ্বনি............




