স্কিপ করে মূল কন্টেন্ট এ যান
This article contains Amazon affiliate links. If you buy through these links, I earn a commission at no extra cost to you.

রহস্যময় শাটল: এক স্বর্গীয় যাত্রার প্রতিফলন

অবিস্মরণীয় প্রথম যাত্রা

আচ্ছা আপনাকে যদি জিগ্যেস করি প্রথম কবে বাসে চড়েছেন? অথবা রিকশা, বেবিট্যাক্সি বা নৌকা? বলতে পারবেন? আমি পারব না। জীবনে প্রথম কবে বাস, ট্রাক, নৌকা, রিকশা চড়েছি এসবের কিছুই মনে নেই। মনে নেই আরও অনেক কিছুই। তবে প্রথম ট্রেনে চড়ার ঘটনা মনে আছে, ২০০৬ সালে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গামী শাটল ট্রেন হয়ত অন্য কোন ট্রেন হলে তাও মনে থাকতো না। কিন্তু শাটল যে এক জাদুর বাহন.... তাই তো প্রথম শাটলের দরজায় বা ইঞ্জিনের সামনে বসা, ছাদে চড়া সব এখনও অনুভব করতে পারি ।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রাণ

আমি চাটগাঁইয়্যা, পড়াশোনাও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমার একাডেমিক পরিচয় পাতায় বিস্তারিত আছে। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই যেটা মাথায় আসে সেটা শাটল ট্রেন। বিশ্ববিদ্যালয় শাটল নিয়ে লিখতে গেলে চোখবন্ধ করে একটা মহাকাব্য লিখে ফেলা যাবে। আমার সুন্দর করে গুছিয়ে লিখার প্রতিভা নাই... থাকলে নিশ্চয়ই শাটল নিয়ে কিছু একটা লিখে ফেলতাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সম্মানিত শিক্ষক তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বলেন; প্রথম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি খুব অবাক হয়েছিলেন কারণ সারা দেশে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে যায় পড়াশোনা করতে, আর চট্টগ্রামের একদল পাগল ছেলেমেয়ে একঘন্টা ট্রেন জার্নি করে গ্রামে যায় পড়াশোনার জন্য

শৈশবের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

"ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে রাত দুপুরে অই। ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে ট্রেনের বাড়ি কই ?" ছোট বেলায় শামসুর রাহমান-এর এই কবিতা পড়ে ট্রেন নিয়ে কত কল্পনা করতাম আর ভাবতাম কখন ট্রেনে চড়ার সৌভাগ্য হবে!! অথবা স্কুলে যখন নৌকা ভ্রমণ বা রেল ভ্রমণ নিয়ে রচনা লিখতে বলতো, অন্যের ভ্রমণ কাহিনী মুখস্থ করে কি আর মন ভরে!!! তবে একদিন শখের শাটলে চড়ে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়ে ছিল। আর প্রথম দিনেই শাটল আর ক্যাম্পাসের প্রেমে পড়া, এত বছরেও যার এক বিন্দুও কমে নি। তাই তো আমার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। যদিও কয়েকমাস পরে চারুকলা শহরে স্থানান্তরিত হওয়ায় সবসময় শাটলে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ায় সুযোগ হয়ে উঠতো না। আর তাই হয়তো আরও বেশি মিস করতাম।

শাটল ট্রেনের সারসত্য ধারণ

ষোলশহর জংশন থেকে সকাল ৭টা৫০ এর ট্রেনে ক্যাম্পাসে যাওয়া আবার বিকাল ৫টা২০ এর ট্রেনে শহরে ফিরে আসা এ ছিল জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্টুডেন্ট জানে শাটল মানে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় গামী একটা ট্রেন নয়; শাটল মানে হাজারো স্বপ্নের ফেরিওয়ালা; শাটল মানে নিত্যদিনের মান অভিমান, আশা-হতাশার গানওয়ালা। গান ছাড়া তো শাটল কল্পনাও করা যায় না, এই শাটলের হাত ধরেই চট্গ্রামের কত বিখ্যাত গায়কের জন্ম। "বিশ্ববিদ্যালয়ের দিন গুলো যায়-যায় হারিয়ে যায় উজ্জ্বল ও বর্ণালী দিন গুলো মিলিয়ে যায় হাওয়ায়।"

শহর থেকে ক্যাম্পাসে যেতে বা ক্যাম্পাস থেকে শহরে পৌঁছাতে অন্তত ৪৫/৫০ মিনিট সময় লাগতো। গান শুনতে শুনতে আর চমৎকার প্রকৃতি দেখতে দেখতে নিমেষেই এ দীর্ঘ সময় কেটে যেত। বটতলী, ঝাউতলা, ষোলো শহর, ক্যান্টনমেন্ট, চৌধুরী হাট, ফতেয়াবাদ কত বাহারি নামের জংশন পাড়ি দিয়ে বিস্তৃত ধানক্ষেত, কাশবন আর পাহাড় সারি দেখতে দেখতে আমাদের ভালবাসার ক্যাম্পাসে পৌঁছানো। ক্লান্তি যেন আমাদের স্পর্শই করতে পারতো না। আমরা যেন আরো বেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠতাম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের স্বপ্নের মতো শাটলের বগিগুলোও ছিল রঙিন। ছাত্রছাত্রীরা নিজেরাই বগিগুলো রাঙিয়ে তুলতো। আবার সবগুলো বগির ভিন্ন ভিন্ন নামও ছিল। মহাপাপী, Always, সি এফ সি (CFC), Orion, এপিটাফ, একাকার, সিক্সটি নাইন(69), উল্কা, ভিএক্স (VX), বিজয়, কনকর্ড, ককপিট, খাইট্যা খা, সাম্পান, রেড সিগন্যাল, ফাটাফাটি,চড়কি আরো কত বাহারি নাম।

@anikdhar

আমাজনে আপনার মিউরাল পেইন্টিং সরঞ্জাম কিনুন

শাটল ট্রেনের জাদুকে শিল্পে ধারণ করা

শাটলে প্রতিদিন কতজন কত স্বপ্ন বুনতো, কত রাগ-অভিমান ভালোবাসার গল্প লিখতো; অনেকে আবার বগির দেয়ালকে ড্রাম হিসেবে বাজিয়ে সকল দুঃখ কষ্ট হতাশা ঝেড়ে দিতো। সে যেন The Polar Express এর মতো রুপকথার জগতে যাওয়ার ট্রেন। তাও আবার যে ট্রেনে উঠতে নামতে টিকেট বা ভাড়ার কোন ঝামেলা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বার্ষিক একটা ভাড়া দিতে হয় তবে তা শাটলে চড়ার আনন্দের তুলনায় নগণ্য। আর ভর্তি পরীক্ষার্থী সহ ভ্রমণকারীদের জন্য শাটল একদম ফ্রি।

প্রতিদিন আগে গিয়ে বন্ধুদের জন্য জায়গা ধরা, দলবেঁধে ছাঁদে চড়া, ভাগাভাগি করে ঝালমুড়িতে আমড়া খাওয়া আরও কত কি। দৌড়াতে দৌড়াতে চলন্ত ট্রেনে উঠার সময় "দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে" র রাজ সিমরানের কথা ভাবেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া ভার। এই শাটলেই শুরু আর শেষ হয়েছে কত ভালোবাসার গল্প।

Watch on YouTube ↗

২০১৭ সালে আমি এই অনুপ্রেরণাকে শিল্পের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলার সুযোগ পাই। একজন বন্ধুর সাথে মিলে আমরা চট্টগ্রামের "6teen Café and Bistro"-এর জন্য একটি দেয়ালচিত্র তৈরি করি। শিল্পকর্মটির বিষয়বস্তু ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকনিক শাটল ট্রেন, যা এর সারমর্ম এবং শিক্ষার্থীদের কাছে এটি যে আনন্দ বয়ে আনে তা ধারণ করে।

আমাজনে আপনার মিউরাল পেইন্টিং সরঞ্জাম কিনুন

এই কমিশন কাজটি শাটল ট্রেনের চিরন্তন আকর্ষণের এক সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে — আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক প্রিয় প্রতীক এবং অফুরন্ত সৃজনশীল অনুপ্রেরণার উৎস। চট্টগ্রাম ও এর স্থাপত্যের সাথে আমার সংযোগ পিকে সেন ভবনের ঐতিহ্য বিষয়ক নিবন্ধেও উঠে আসে।

বিশ্বে অনন্য

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় তার অনন্য ট্রেন সেবার জন্য বিশ্বব্যাপী আলাদাভাবে পরিচিত — অপরূপ প্রকৃতি, পাহাড় আর ঝরনার পটভূমিতে শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা সত্যিই অতুলনীয়। এখানে রয়েছে নিজস্ব জাদুঘরও। কলা ভবনের বিখ্যাত "ঝুপড়ি ঘর", তার সুস্বাদু খাবার নিয়ে, যুগের পর যুগ ধরে শিক্ষার্থীদের মন মুগ্ধ করে আসছে।

চিরন্তন ভালোবাসা

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে শেষ গিয়েছি অনেকদিন হলো, দেশে-বিদেশে নানা ট্রেনে চড়েছি, তবু শাটলের সাথে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। বছরের পর বছরে সে বদলেছে, রঙ আর আগের মতো নেই, কিন্তু শাটল ট্রেনের প্রতি আমার ভালোবাসা একটুও বদলায়নি। এখনও তার রঙ অনুভব করি, ভালোবাসার গন্ধ পাই। তবুও বলবো ভালোবাসি শাটল ট্রেন, ভালোবাসি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।